ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার যে প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার যে প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

শিক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ঘ-ইউনিট ও চারুকলা অনুষদের চ-ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা প্রকাশের পর এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভক্ত হয়ে পড়েছেন শিক্ষকেরাও।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য অংশই মনে করছেন, এর ফলে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিষয় বাছাইয়ের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গেই অসংগতিপূর্ণ।সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদের ডিনদের এক বৈঠকে উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে তিনটি ইউনিটে অর্থাৎ বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসা -এই তিন ইউনিটে পরীক্ষা নেওয়ার প্রাথমিক একটি প্রস্তাব করেন।

তার এ প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ঘ ইউনিট ও চারুকলার চ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে

কিন্তু এ প্রস্তাবের যুক্তি কি বা কেন এমন প্রস্তাব তিনি করেছেন জানতে চাইলে উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‌‘আমি শুধু বলবো আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো পরিশীলিত হবে এবং যেটি ভালো সিদ্ধান্ত হবে সেটিই আমরা গ্রহণ করবো। এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য আমি করবো না’।

প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে ভর্তির ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক ইউনিটে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের খ ইউনিটে এবং ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের গ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হত।

আর উচ্চ মাধ্যমিকের বিভাগ পরিবর্তনের জন্য বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ইউনিটে আবেদনের যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটে আবেদন করতে পারেন।

ঘ ইউনিটে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা যারা এইচএসসিতে যে বিভাগে ছিল তার পরিবর্তে সামাজিক বিজ্ঞানের আওতায় ১২টি বিষয় থেকে তার পছন্দনীয় সাবজেক্টে ভর্তির সুযোগ পেতে পারেন। অর্থাৎ বিজ্ঞান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়গুলোতে আবার ব্যবসায় থেকে আসা শিক্ষার্থীরা মানবিকের বিষয়গুলোতে আসার সুযোগ নিতে পারতেন।

অপরদিকে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের যারা চারুকলা ভর্তি হতে চান, তাদের চ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হত।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ধারণা এখন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর চিন্তা থেকেই ঘ ও চ ইউনিট বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা এসেছে বলে মনে করেন তারা।

যদিও চারুকলা ইন্সটিটিউটের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলছেন চারুকলায় পরীক্ষা হবেই। ‘পরীক্ষা ছাড়া চারুকলার বিকল্প নেই। দরকার হলে আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটগুলো একযোগে আলাদা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার কথা ভাবতে পারি। তখন কি করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,’ বলছিলেন তিনি। 

অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ডিনস কমিটির বৈঠকে চ-ইউনিটের প্রসঙ্গই ওঠেনি অথচ পরে সেটি গণমাধ্যমে এসেছে উপাচার্যের বরাত দিয়ে।

তিনি বলেন, ‘আমাকে নিশ্চিত হবে যে চারুকলায় যিনি ভর্তি হবেন তার আর্ট কালচার নিয়ে আগ্রহ আছে এবং এগুলো নিয়ে তিনি জানার চেষ্টা করেন। আর সেটির একমাত্র উপায় পরীক্ষা নেয়া। ৭২ বছর ধরে তাই পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে’।

প্রসঙ্গত, গড়ে প্রতি বছর ১৫-১৬ হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়ে থাকে।

বিতর্ক হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞানের ডি বা ঘ ইউনিট নিয়ে

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফেরদৌসি রেজা চৌধুরী এইচএসসিতে ছিলেন বিজ্ঞান বিভাগে কিন্তু পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘ ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনা করেছেন দর্শনে। পরে আইনে পড়াশোনা করে আইন পেশায় যুক্ত হন। 

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলছেন, ডি ইউনিটের পরীক্ষা না থাকলে অসংখ্য শিক্ষার্থীদের জন্য এ সুযোগটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ঘ’ ইউনিটের ১ হাজার ৫৬০ আসনের জন্য ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯৭ হাজার ৪৬৪ জন আর তার আগের বছর ‘ঘ’ ইউনিটে ১ হাজার ৬১৫ আসনের বিপরীতে মোট ৯৫ হাজার ৩৪১ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন।

২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ‘ঘ’ ইউনিটের অধীনে বিভিন্ন অনুষদে ১,৬১০টি আসনের বিপরীতে এ বছর ৯৮ হাজার ৫৬টি আবেদন জমা পড়েছিল, তবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৭১ হাজার ৫৪৯ জন।

সাদেকা হালিম বলেন, বিষয়টি মিটিংয়ের আলোচনার এজেন্ডাতেই ছিল না। কিন্তু উনি (উপাচার্য) তুলেছেন এবং উনার যুক্তি ছিল চাপ (ভর্তিুচ্ছদের) কমাতে হবে।

‘কিন্তু এর এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা কোয়ালিটি রক্ষা করে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করতে চাই। মনে রাখতে হবে এ সুযোগ চলে গেলে বিপুল সংখ্যক মেধাবীরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। অথচ আমরাই মাল্টি ডিসিপ্লিন গবেষণাকে উৎসাহিত করার অঙ্গীকার করেছিলাম,’ বলেন সাদেকা হালিম।

তিনি জানান, তার অনুষদের শিক্ষকরা সভা করে একমত হয়েছেন যে তারা স্বতন্ত্র ইউনিটের মাধ্যমেই পরীক্ষা নিবেন এবং সামনে একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় তিনি সেটিই তুলে ধরবেন।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি অনুষদের ডিনরা চান উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার ভিত্তিতে তিনটি ইউনিটেরই পরীক্ষা হোক।

আর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও চারুকলা অনুষদের পরীক্ষা কিভাবে এগুলোর সাথে সমন্বয় করে নেওয়া হবে সেটি নিয়ে তারা আরও আলোচনার পক্ষপাতী।

যদিও কলা অনুষদের ডিন দেলোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি।

যেসব জটিলতার আশঙ্কা করা হচ্ছে

শিক্ষকদের অনেকে বলছেন, শুধু বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের ভিত্তিতে পরীক্ষা নিয়ে কিভাবে বিভাগ পরিবর্তন করা যাবে এবং তাতে মেধার বিচার কিভাবে হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা।

অন্যদিকে প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের যে অভিযোগ ওঠে তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পরীক্ষা ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনার চিন্তা কতটুকু কাজে দেবে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

‘প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সেটার জন্য পরীক্ষা কমানো বা শিক্ষার্থীদের চাপ কমানোর যুক্তি হাস্যকর,’ বলছিলেন একজন শিক্ষক, তবে তিনি তার নাম না প্রকাশ করার অনুরোধ করেছেন।

যদিও চারুকলার অধ্যাপক নিসার হোসেন মনে করেন পুরো বিষয়টির সঙ্গে ‘ষড়যন্ত্র’ জড়িত আছে।

‘একটি অংশ চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাতন্ত্র ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দিক। তারাই শুধু নাম্বারের ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ দেয়ার কথা তোলেন। এটি হলে বিশ্ববিদ্যালয় অসাম্প্র্রদায়িক চেতনাই হারিয়ে ফেলবে,’- বলছিলেন তিনি।