ডব্লিউএইচও

করোনা বায়ু বাহিত – মাক্স পড়তে হবে ঘরেও – ডব্লিউএইচও এর কাছে বিজ্ঞানীদের চিঠি

স্বাস্থ্য

৩২টি দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী এক খোলা চিঠিতে এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন হালনাগাদ করার আহ্বান জানানোর পর জাতিসংঘের এ সংস্থার তরফ থেকে স্বীকারোক্তি এল। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল প্রধান ড. মারিয়া ফন কেরকোভে জেনিভায় এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে বা বাতাসে ভাসমান ভাইরাল কণার মাধ্যমে সংক্রম ঘটাতে পারে কি না সেই সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বরাবরই বলে আসছে, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশির সময় শ্বাসতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা ভাইরাল জলকণা থেকেই মূলত এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। তবে অপেক্ষাকৃত বড় কণাগুলো ভারী হওয়ায় দ্রুত নিচে পড়ে যায়।

কিন্তু ২৩৯ জন বিজ্ঞানী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে লেখা খোলা চিঠিতে প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, বাতাসে ভেসে থাকা একেবারে ক্ষুদ্র ভাইরাসবাহী কণা থেকেও মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। তাদের ওই চিঠি সোমবার ক্লিনিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেস জার্নালেও প্রকাশ করা হয়েছে।

ওই চিঠিতে সই করা ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর কেমিস্ট হোসে হিমেনেস বলেন, এই ‘প্রমাণগুলোর’ কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকার করুক, সেটাই তারা চেয়েছেন।

“এটা মোটেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আক্রমণ করা নয়। এটা একটা বৈজ্ঞানিক বিতর্ক। আমাদের মনে হয়েছে, এটা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা উচিৎ, কারণ বহুবার আলোচনা হলেও তারা আমাদের প্রমাণগুলো শুনতে অস্বীকার করে আসছিল।”

মঙ্গলবার জেনিভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্রিফিংয়ে এ সংস্থার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের বেনেদেত্তা আলেগ্রানজি বলেন, “করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর প্রমাণ আসছে, কিন্তু বিষয় হল, সেগুলো নিশ্চিত কিছু নয়।   

“সেখানে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশে, আবদ্ধ জনাকীর্ণ ঘরে, যেখানে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, সেখানে বায়ুবাহিত সংক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

“তবে এসব প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি।” 

এর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসে বিজ্ঞানীদের ওই চিঠির খবর প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, এ ভাইরাস যদি সত্যিই বাতাসে বাহিত হয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াতে পারে, বিশেষ করে সেসব জায়গায়, যেখানে অবাধে বাতাস চলাচল নেই, কিন্তু মানুষের সমাগম বেশি, তাহলে ভাইরাস ঠেকানোর পরিকল্পনাতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।

সেক্ষেত্রে মাস্ক পরতে হবে ঘরের মধ্যেও। সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মানার পরও আবদ্ধ জায়গায় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দিতে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের এন ৯৫ মাস্ক পরে নিতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নার্সিং হোম, বাসাবাড়ি আর অফিসে এয়ার কন্ডিশনার বা এয়ার কুলারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে, বসাতে হবে বাতাস বিশুদ্ধ করার শক্তিশালী ফিল্টার। এমনকি ঘরের ভেতরে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ভাইরাসবাহী অতিক্ষুদ্র কণাগুলো ধ্বংস করতে অতিবেগুনী রশ্মিও ব্যবহার করতে হতে পারে। 

গত ২৯ জুন প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যেও বলা হয়েছে, কেবল তখনই এ ভাইরাস বাতাস বাহিত হয়ে সংক্রমণ ঘটাতে পারে যদি ভাইরাল জলকণা বা ড্রপলেটের আকার ৫ মাইক্রনের চেয়ে ছোট হয় (১ মাইক্রন = ১ মিটারের ১ মিলিয়নতম ভাগ)।

আর কেবল তখনই আবদ্ধ পরিবেশে বায়ু চলাচলের সুবিধা বা এন ৯৫ মাস্ক পরার কথা ভাবা উচিৎ বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

মহামারীর শুরু থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তাদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নির্দেশনায় প্রাথমিক সুরক্ষাবিধি হিসেবে ঘন ঘন হাত ধোয়ার কথা জোরেশোরে বলে আসছে।

অথচ কোনো বস্তুর উপরিতল থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটার প্রমাণ খুব বেশি নেই। (যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এখন বলছে, কোনো কিছুর উপরিতল এই ভাইরাস ছড়াতে সামান্য ভূমিকাই রাখে।)

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, অন্তত ২০ জন বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার তারা নিয়েছে, যাদের মধ্যে এক ডজন গবেষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক, কেউ কেউ আবার এই সংস্থার গাইড লাইন তৈরির সঙ্গেও যুক্ত, তারা কেউ এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। 

এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁচি বা কাশির সময় বাতাসে ছড়ানো বড় আকারের ভাইরাল কণাই হোক, অথবা ঘরের শেষ মাথা পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে- এমন ছোট আকারের কণা, দুইভাবেই বাতাসে ভাসমান করোনাভাইরাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

সিডনিতে ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের এপেডেমিওলজিস্ট ম্যারি-লুইস ম্যাকলস বলেন, “বাতাসের প্রবাহ আর ভাইরাল কণার আকার নিয়ে এই বিতর্কে আমি হতাশ। যদি আমরা প্রবাহমান বাতাসের প্রভাবের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে যাই, তাহলেই হয়ত আমাদের এতদিনের অনেক সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে।”

তিনি বলেন, “পর্যালোচনা করে দেখার বিষয়টি খুব ভালো একটি আইডিয়া। কিন্তু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের এটা বড় ধরনের ঝাঁকি দেবে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে পৃথিবীর সব দেশ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তাদের স্বাস্থ্যবিধি তৈরি ও কার্যকর করে আসছে। সংক্রমণ এড়াতে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মও চালু হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে। এখন করোনাভাইরাস বাতাসে বাহিত হয়ে সংক্রমণ ছড়ালে সেই নিয়মও আর খাটবে না।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যে বাতাস বাহিত হতে পারে, সে বিষয়টি আমলে নিতে এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল ৩৬ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সে সময় বেশ দ্রুতই সাড়া দিয়েছিল, বিজ্ঞানীদের এই দলটির নেতা লিডিয়া মোরস্কাকে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

লিডিয়া মোরস্কা নিজেও দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শক হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাদের সঙ্গে সেই আলোচনায় অন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য বেশি গুরুত্ব পায়, যারা হাত ধোয়ার ওপরেই জোর দিতে চান। ফলে সুরক্ষা বিধিমালায় কোনো পরিবর্তন সে সময় আনা যায়নি।

মোরস্কা এবং আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন, যেখানে ঘরের বদ্ধ পরিবেশে বেশি লোকসমাগমের স্থানে বাতাসের মাধ্যমেই ভাইরাস ছড়িয়েছিল।

তাদের ভাষ্য, ভাইরাসবাহী জলকণার আকার ছোট না বড়- তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খামোখাই পার্থক্য তৈরি করছে, কারণ একজন আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশিতে দুই ধরনের ড্রপলেটই বাতাসে ছড়ায়।

ভার্জিনিয়া টেকের বাতাসবাহিত ভাইরাস সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ লিনসে মার বলেন, “সেই ১৯৪৬ সাল থেকে আমরা জানি, মানুষ কাশলে, এমনকি কথা বললেও বাতাসে অতিক্ষুদ্র জলকণা ছড়াতে পারে।”

বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে সেই জলকণা কালচার করে এখনও করোনাভাইরাসের সংখ্যা বাড়াতে পারেননি। কিন্তু তাতে এটা প্রমাণ হয় না যে ওই ভাইরাল কণা সংক্রামক নয়।

মার বলেন, এসব গবেষণার বেশির ভাগ নমুনাই এমন সব হাসপাতাল থেকে আসে যেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বেশ উন্নত, এটা বাতাসে ভাইরাসের পরিমাণকে কমিয়ে দিতে পারে।

“কিন্তু বেশির ভাগ ভবনে বাতাস চলাচলের পরিমাণ অনেক কম থাকে, তাতে ভাইরাস বাতাসে বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে থেকে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে মারিয়া ফন কেরকোভে বলেন, করোনাভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাব্য উপায়গুলো সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা যা জানা গেছে, সেগুলোর সমন্বয় করে শিগগিরই একটি ‘সায়েন্টিফিক ব্রিফ’ তারা প্রকাশ করবেন।

“সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য আমাদের একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হবে। শুধু শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা নয়, নির্দিষ্ট স্থানে বা পরিবেশে, যেখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়, সেখানে মাস্কও পরতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এটা জরুরি।”