করোনা মোকাবেলায় করনীয় – বিশেষ প্রতিবেদন

স্বাস্থ্য

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।আসসালামু আলাইকুম।

পৃথিবী আজ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরত।সারাবিশ্বের মানুষ লড়ছে করোনা ভাইরাস নামক সাধারণভাবে অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে।আমি এ আর্টিকেলটি লেখা পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে হানা দিয়েছে করোনা ভাইরাস এবং তার আক্রমণে প্রাণ গেছে প্রায় ১,৯৫,৯২০ জন মানুষের; আর আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২৭লক্ষ মানুষ।এটি এখনো অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে।শুধু মানুষের জীবনই নয়, অর্থনীতিকেও এটি ধ্বংস করছে যার প্রভাবে আরও অনেক মানুষ ও অন্যন্য প্রাণী জীবনহানি হতে পারে এবং ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে লেগে যেতে পারে বছরের পর বছর।বাংলাদেশেও এটি আক্রমণ শুরু করেছে।যেহেতু এটি একটি নতুন ভাইরাস এবং এর গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন চমকিয়ে দেওয়ার মত সুতরাং বিশ্বের অন্যন্য দেশের মত বাংলাদেশেও রোগত্বত্ত্ববিদ থেকে শুরু করে সরকার ও সাধারণ মানুষও এ ভাইরাস-আক্রমণের শেষ পরিণতি ও এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো এই ভাইরাসকে ‘ব্রিলিয়ান্ট ও জিনিয়াস’ হিসাবে অভিহিত করেছেন।এরকম একটি শক্তিশালী ও জিনিয়াস শত্রুকে পরাজিত করতে তার সম্পর্কে জানা ও তাকে নিধনে কৌশলী হওয়া অত্যন্ত জরুরি।আমি এ পোস্টে সে বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

করোনা ভাইরাসের চেয়ে আমি কতটা শক্তিশালী ?

কোন ভাইরাস শরীরের প্রবেশ করলে শরীর তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে আর এই অ্যান্টিবডিই সেই ভাইরাসকে মেরে ফেলে রোগমুক্তি ঘটায়।অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি সেই মানুষটিকে ওই ভাইরাসের হাত থেকে দীর্ঘসময় প্রতিরক্ষা দিয়ে থাকে।ভাইরাসকে পরাজিত করতে ভ্যাকসিনের গুরুত্ব এখানেই।ভ্যাকসিনে রোগ তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করে সেই ভাইরাসকে বা ভাইরাসের অংশবিশেষকে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।ফলে এটি রোগ তৈরি করতে পারে না কিন্তু দেহের ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করে অ্যান্টিবডি তৈরি করায় যা পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা প্রদান করে।যেহেতু আলোচিত করোনা ভাইরাস সম্পুর্ণ নতুন একটি ভাইরাস তাই পৃথিবীর কোন মানুষের শরীরেই এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি ছিলো না। তাই পৃথিবীর সকল মানুষই এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন।পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেমের অধিকারী ব্যক্তির শরীরেও এ ভাইরাস অনাসায়ে প্রবেশ করতে পারে।সুতরাং আমি ‘করোনা ভাইরাসের চেয়ে শক্তিশালী’ এরকম ভাবনা আপনাকে এবং আপনার কারণে অন্যদেরকেও নিশ্চিত বিপদে ফেলবে।

‘HERD IMMUNITY’ বা ‘গণ প্রতিরক্ষা’

একটি পরিবেষ্টিত এলাকার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেলে তারা বাকি মানুষদের জন্য অনেকটা ঢাল হিসাবে কাজ করে।এ অবস্থায় ভাইরাসের বিস্তার এতটাই ধীর হয়ে যায় যে তা প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।এটাকে ‘HERD IMMUNITY’ বা ‘গণ প্রতিরক্ষা’ বলা হয়।হার্ড ইউমিনিটি অর্জনের মোক্ষম অস্ত্র হলো ভ্যাকসিনেসন। কিন্তু করোনার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন এখনও পরীক্ষামূলক বা ট্রায়াল স্টেজে আছে যা সহজলভ্য হতে ১বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।সুতরাং সে সময় পর্যন্ত আমাদেরকে করোনার সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করতে হবে।সুতরাং আগামি ১ বা ২ মাসের মধ্যে আমরা করোনাকে কাইত করে ফেলব বলে আত্মতুষ্টিতে ভূগলে করোনা আপনাকে করুণা করবে না।তবে অন্যন্য ভাইরাস সংক্রমণের মত করোনা সংক্রমণেরও এটা প্যাটার্ণ রয়েছে।প্রথমে দীর্ঘ সময় ধরে খুব ধীরে ধীরে ছড়াতে শুরু করে তারপর ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হয় তুলনামূলক কম সময় ধরে (যাকে ‘পিক’ বলা হয়) তারপর অপেক্ষাকৃত কম দ্রুততায় দীর্ঘসময় ধরে ছড়াতে থাকে।সুতরাং পিক টাইমের পর করোনা সংক্রমণের হার কমে যাওয়াকে সাফল্য হিসাবে দেখলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কঠোরভাবে লকডাউনে প্রাথমিক সুফল পাওয়া দেশগুলোকে লকডাউন সহসাই তুলে নেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।করোনা নিয়ন্ত্রণে চীনের আপাত সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করলে বিরাট ভুল হবে।কারণ চীনের অধিকাংশ লোকের শরীরে করোনা প্রবেশ করেনি।তাই চীন এখনও করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

কতজন মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে ‘হার্ড ইউমিউনিটি’ অর্জিত হবে তা Ro (R-naught) এর উপর নির্ভরশীল।আর-নট হলো একজন আক্রান্ত রোগি কতজনকে সংক্রমিত করতে পারে তার সংখ্যা।নব করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে ‘আর-নট’ ২-৩.৫।সে হিসাবে আনুমানিক ৫০%-৭০% মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো আপাত সম্ভব নয়।

কতজন লোক করোনায় মারা যেতে পারে?

যেহেতু করোনার বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন নাই তাই প্রাকৃতিকভাবেই এর গতি রুদ্ধ হবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা ‘গণ প্রতিরক্ষা’ অর্জনের মাধ্যমে। সাধারণভাবে যেহেতু একটি জনগোষ্ঠির ৫০%-৭০% এর শরীরে করোনা ভাইরাস প্রবেশ করলে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়ার পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যায় সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৬ কোটি জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রায় ৮-১১ কোটি লোক করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন মারা যাবে তা নির্ভর করে ‘Case Fatality Rate’ বা ‘মৃত্যুহার’ এর উপর। ৩রা মার্চ প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুসারে করোনায় মৃত্যুহার ৩.৪%।অাবার প্রভাবশালী জার্ণাল ‘ল্যানসেট’ এ উপস্থাপিত তথ্যানুসারে এ হার ০.৬৬%।কারণ রাষ্ট্র ঘোষিত আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যার অনেকগুণ বেশি বাস্তবে উপস্থিত থাকার ধারণা প্রবল।আমরা যদি মৃত্যুহার ০.৬৬% হিসাবেও ধরি তাও বাংলাদেশে ৮-১১ কোটি আক্রান্তের মধ্যে ৫-৭ লক্ষ লোক মারা যেতে পারে।ফাঁস হওয়া জাতিসংঘের গোপন নথিতে অবশ্য ৫-২০লক্ষ লোক মারা যাওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে।ফাঁস হওয়া জাতিসংঘের আন্তঃসংস্থা নথির ব্যাপারে আরও জানতে ৮ নং রেফারেন্স লিংক ক্লিক করুন।

করোনার বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন আদৌ তৈরি করা সম্ভব হবে কিনা

মোটাদাগে বলা যায় যতদিন কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হচ্ছে কিংবা প্রাকৃতিকভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জিত না হচ্ছে।কিন্তু দুঃখের বিষয় ইতিমধ্যে যদি কোন ১০০% কার্যকরী এবং ১০০% পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েও থাকে সেটি বাজারজাত করতে যেসব ধাপ অতিক্রম করতে হবে তাতে কমপক্ষে ১ বছর সময় লাগবে।স্মর্তব্য প্রাণঘাতি ইবোলা ভাইরাসের কার্যকরী ভ্যাকসিন rVSV-ZEBOV vaccine ২০১৪ সালে মানুষের উপর প্রয়োগের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়।আর এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অর্থাৎ মাত্র চার মাস আগে।আর এটিকেই বলা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততার সাথে প্রিকোয়ালিফাই করা ভ্যাকসিন।সুতরাং ‘আগামী ৩ মাসের মধ্যে করোনা ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে’, ‘সেপ্টেম্বরের মধ্যেই করোনা ভ্যাকসিন’, ‘চীন অলরেডি ভ্যাকসিন বের করে ফেলেছে’ ইত্যাদি খবরের কাগজের চটকদার সংবাদে বিভ্রান্ত হবেন না প্লিজ।সমস্যা আরো রয়েছে।নতুন এই করোনা ভাইরাস গত সাড়ে চার মাসে ৮টি স্ট্রেইন বা টাইপ তৈরি করে ফেলেছে। আবার এক প্রকার করোনা ভাইরাস দ্বারা তৈরি ভ্যাকসিন অন্য প্রকারের করোনার উপর কাজ করার সম্ভাবনা কম।আল্লাহই জানেন এটি আর কত টাইপ তৈরি করবে।উল্লেখ্য এইডসের বিরুদ্ধে আজ অবধি কোন ভ্যাকসিন বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি।অতএব আগামী ১ বছর বিশ্বের হাতে করোনা বধের কোন মোক্ষম অস্ত্র করতলগত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।এমনকি করোনার বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন আদৌ তৈরি করা সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে আমার দৃঢ় সন্দেহ রয়েছে কারণ ভাইরাসটি গড়ে ১৫দিন অন্তর অন্তর নতুন টাইপ তৈরি করছে।যারা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঔষধ ও ভ্যাকসিনের গবেষণার সর্বশেষ তথ্য জানতে চান তারা রেফারেন্সের ৭ নং লিংকে ক্লিক করুন।

কনভ্যালিসেন্ট প্লাজমা থেরাপি

আর প্রাকৃতিকভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনে কত সময় লাগবে সেটা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর ১)কত দ্রুততার সাথে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে ২) আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি তাকে কতদিন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা দিতে পারছে ৩) ভাইরাসটি কতটি স্ট্রেইন বা টাইপ তৈরি করছে এবং ৪) জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের উপর।যেহেতু এই করোনা ভাইরাসটি নতুন সুতরাং ১ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ধারনা করা কঠিন যে আক্রান্ত রোগির দেহে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি তাকে কতদিন প্রতিরক্ষা দিতে পারবে।সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘কনভ্যালিসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’ দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সতর্ক করে বলেছেন যে করোনা রোগ থেকে সুস্থ হয়ে উঠা সকল রোগির দেহে অ্যান্টিবডি থাকে না। আর্জেটিনা, ইটালি এমনকি মহারাষ্ট্রেও করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠার পরপরই পুনরায় করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কেস পাওয়া গেছে।তাছাড়া করোনা ভাইরাসটি ইতিমধ্যেই ৮টি স্ট্রেইন/টাইপ তৈরি করে ফেলেছে।কাজেই এক টাইপে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠার পর অন্য টাইপ দিয়ে একজন আবার আক্রান্ত হতে পারেন।এসব বিষয় বিবেচনায় প্রাকৃতিকভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন অনতিবিলম্বে সম্ভব নাও হতে পারে।

সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায় দৈবক্রমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রিত না হলে অন্তত আগামী ১ বছর কিংবা তারচেয়েও বেশি সময় করোনার হাত থেকে আমাদের মুক্তি নাও মিলতে পারে।

প্রধান উপসর্গ

জ্বর-কাশি-গলা ব্যাথা-শ্বাসকষ্ট করোনার এই ৪প্রধান উপসর্গ সম্পর্কে আপনারা অবগত।কিন্তু ইদানিং মিডিয়ায় মাঝে মাঝে শিরোনাম হয় ‘করোনার নতুন উপসর্গ পাওয়া গেছে’।আমার কাছে মনে হয়েছে করোনা ভাইরাসের প্যাখোফিজিওলজি তথা রোগ তৈরি করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারনা না থাকায় এসব তথ্য এভাবে শিরোনাম হচ্ছে।আসুন আপনাদেরকে কোভিড-১৯ রোগের আরও যেসব উপসর্গ থাকতে পারে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।করোনা ভাইরাস আমাদের শরীরে প্রবেশ করার পর আমাদের দেহের কোষের আবরণীতে থাকা যেসব উপাদানের সাথে জোট বেঁধে কোষের ভিতর প্রবেশ করে তার প্রধান দুটি উপাদান হলো সায়ালিক এসিড এবং ACE2 রিসেপ্টর।দেখা যাক অামাদের দেহে কোথায় কোথায় সায়ালিক এসিড ও ACE2 রিসেপ্টর আছে?-

ব্রেন-দেহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সায়ালিক এসিড আছে ব্রেনে।স্বভাবতই এখানে করোনা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যাওয়ার কথা।বাস্তবে হচ্ছেও তাই।এখন ঘ্রাণ না পাওয়া (Anosmia)কে করোনা ভাইরাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উপসর্গ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।করোনা আক্রান্ত ব্রেনে আরও যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো- স্বাদের তারতম্য (Dysgeusia), অতিরিক্ত জ্বর, মাথাব্যাথা, শরীর ভীষণ দূর্বল লাগা, মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা, উত্তেজিত হওয়া, অস্থির হওয়া, দ্বিধান্বিত হওয়া (Confusional state), স্থান-কাল-পাত্র বুঝতে সমস্যা হওয়া (Disorientation), অতিরিক্ত কথা বলা, ঘুম ঘুম লাগা, কথা বলতে অসুবিধা হওয়া, অবশ লাগা, খিঁচুনি হওয়া, চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া, স্ট্রোক, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া, কমা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।করোনা আক্রান্ত বেশ কিছু রোগির একমাত্র ‘ঘ্রাণ না পাওয়া’ ছাড়া আর কোন উপসর্গ পাওয়া যায়নি।কেবলমাত্র স্ট্রোকের উপসর্গওয়ালা করোনা রোগি পাওয়া গেছে।সুতরাং করোনায় ফ্লু এর মত জ্বর-কাশি-শ্বাসকষ্ট থাকবে এরূপ বদ্ধমূল ধারনা হলে অনেক কেসই ডায়াগনোসিসের বাইরে রয়ে যাবে এবং করোনা ছড়াবে।যেভাবে করোনা নতুন নতুন টাইপ তৈরি করছে তাতে ‘সেরেব্রাল করোনা’ বা ‘করোনাল এনকেফালাইটিস’ হাজির হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এছাড়াও সংক্রমণ পরবর্তী অর্থাৎ রোগমুক্তির পরও নানারূপ মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা যেমন ঘুম না হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুমানো, বিষণ্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, মুড পরিবর্তন, নিউরোমাসকুলার ডিসফাংসন ইত্যাদি সমস্যায় দীর্ঘদিন ভূগতে হতে পারে।যাদের উপসর্গবিহীন করোনা ছিলো (Asymptomatic cases) তারাও এ ধরনের সমস্যায় ভূগতে পারেন।সুতরাং করোনা রোগ নির্ণয়ে এবং রোগ পরবর্তী সময়েও স্নায়বিক উপসর্গগুলোর ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যকীয়।

শ্বাসতন্ত্র– পুরো শ্বাসতন্ত্রের আবরণী কোষে সায়ালিক এসিড ছড়িয়ে আছে এবং নিঃসৃত মিউসিনের (যা কফ আকারে দেখি) একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সায়ালিক এসিড।ফুসফুসে ACE2 রিসেপ্টরের উপস্থিতিও ব্যাপক।যার ফলে শ্বাসতন্ত্র করোনা আক্রমণের প্রাইমারি টার্গেট। শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহে জ্বর, শুকনো কাশি, গলাব্যাথা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।তাছাড়া ফুসফুসের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্থ করায় ফুসফুসে পানি জমে এবং বায়ুকুঠুরির সেল প্রদাহজনিত ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় উভয় কারণে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন-কার্বন ডাই অক্সাইডের লেনদেন করতে পারে না।ফলে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এমনকি তীব্র মাত্রার শ্বাসকষ্ট (Severe Acute Respiratory Distress)) এর মত অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং অনেক মানুষ মারা যায়।কফ-কাশিতে করোনার উপস্থিতিও কিন্তু সায়ালিক এসিডের সাথে মজবুত বন্ধনের কারণে। হয়ত এ কারণেই হাঁচি-কাশিতে এ ভাইরাস মুক্ত আকারে বাতাসে ভেসে না বেড়িয়ে রেসপিরেটরি ড্রপলেটে থাকে।

লালা– লালার একটি উপাদান হলো সায়ালিক এসিড যার ফলে লালায় করোনা ভাইরাস উপস্থিত থাকে। এজন্য কথা বলার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন এজন্য যে নিক্ষিপ্ত লালা কণায় ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।যেখানে সেখানে থুথু ফেলা, থুথু আঙ্গুলে লাগিয়ে টাকা গোনা বা চুমু খাওয়া বা জোরে কথা বলা বা খুব নিকটে থেকে কথা বলা বা দুয়া পড়ে ফু দেওয়া (দুয়া পড়ুন কিন্তু ফু দিয়েন না) থেকে বিরত থাকা জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Rutgers University’র Professor Andrew করোনা নির্ণয়ে লালাকে স্যাম্পল হিসাবে ব্যবহার করে একটি টেস্ট মেথড আবিষ্কার করেছেন এবং এফডিএ মধ্য এপ্রিলে অনুমোদনও দিয়েছে। এর মাধ্যমে নাক-গলা থেকে স্যাম্পল নেওয়ার যে ঝুঁকি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে থাকেন তা হ্রাস পাবে।

পরিপাক তন্ত্র- পুরো পরিপাক তন্ত্রের আবরণী কোষের লুমিনাল সারফেসে সায়ালিক এসিড থাকে।ফলে এসব কোষে করোনা ভাইরাস প্রবেশ করে প্রদাহ তৈরি করতে পারে।অন্ত্রের এরূপ প্রদাহকে ‘গ্যাস্ট্রো এনটারাইটিজ’ বা ‘স্টোমাক ফ্লু’ বলা হয়।স্টোমাক ফ্লু এর কারণে পেট ব্যাথ্যা, বমি বমি ভাব, বমি ও ডায়রিয়া হয়।জ্বরও হতে পারে।পরিপাকতন্ত্র নিঃসৃত মিউকাসেও সায়ালিক এসিড থাকে।ফলে পায়খানার সাথে এ ভাইরাস বের হতে পারে। করোনা রোগি শুধুমাত্র ‘স্টোমাক ফ্লু’ এর উপসর্গ নিয়েও আসতে পারে।

ইমিউন বা রোগ প্রতিরোধক সিস্টেম– করোনার কারণে দেহের কোষগুলো যখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন এদের নিঃসৃত নানা উপাদানে উদ্দীপ্ত হয়ে ইমিউন সিস্টেমের শ্বেত রক্ত কণিকাসমূহ প্রচুর পরিমাণে প্রদাহসৃষ্টিকারী জৈব রাসায়নিক উপাদান ‘সাইটোকাইন’ নিঃসরণ করে যা ‘সাইটোকাইন ঝড়’ নামে পরিচিত।সাইটোকাইন ঝড়ের কারণে সেপটিক সক বা তীব্র মাত্রার শ্বাসকষ্ট (Severe acute respiratory distress) এর মত অবস্থা তৈরি যা করোনা রোগির মৃত্যুর প্রধান কারণ।এসময় রোগিকে ভেন্টিলেটরে দিয়েও খুব একটা লাভ হয় না।এ কারণেই আইসিইউতে ভেন্টিলেটরে রাখা রোগিদের অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করে।

ইমিউন সিস্টেমের আরও দুই অতন্দ্র প্রহরী হলো টি-লিম্ফোসাইট ও বি-লিম্ফোসাইট। টি-লিম্ফোসাইট সরাসরি এবং বি-লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে আক্রমণকারী জীবাণুকে ধ্বংস করে থাকে।উভয় লিম্ফেসাইটেরই আবরণীতে সায়ালিক এসিড আছে। এসব কোষ করোনা ভাইরাস দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে এবং সাইটোকাইন দ্বারা পরোক্ষভাবে আক্রমণের শিকার হয় এবং মারা যায়।এজন্য করোনা রোগির রক্তে লিম্ফোসাইটের মাত্রা কমে যায় (বিশেষত টি-লিম্ফোসাইট) যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘লিম্ফোপেনিয়া’ বলে।করোনা রোগি ভালোর দিকে যাচ্ছে না খারাপের দিকে যাচ্ছে তা লিম্ফোসাইট পরিমাপ করে ধারনা পাওয়া যায়।উল্লেখ্য এইডস ভাইরাস টি-লিম্ফোসাইটকে আক্রমণ করেই রোগ তৈরি করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ্যান্টিবডি তৈরিকারী বি-লিম্ফোসাইট আক্রান্ত হলে করোনার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি বাঁধাগ্রস্থ হয় ফলে রোগ দীর্ঘায়িত হয় (করোনা রোগির আক্রান্তের হারের চেয়ে সুস্থ হওয়ার হার অনেক ধীর হওয়ার এটি একটি কারণ) এবং অনেকক্ষেত্রে ভাইরাসের সংখ্যা ও এর দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে রোগ জটিল পর্যায়ে চলে যায় বা রোগি মারা যায়।বি-লিম্ফোসাইটের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে আরও ৩টা সমস্যা হতে পারে এক.– পরিমিত অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়ায় রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই রোগি আবার করোনায় আক্রান্ত হতে পারে যা বর্তমানে বেশকিছু কেসে দেখা যাচ্ছে দুই.– প্রাকৃতিকভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করা সম্ভব হবে না যার ফলে অসংখ্য মানুষ মারা যাবে তিন.- পরিমিত অ্যান্টিবডি না থাকলে সে প্লাজমা ‘কনভ্যালিসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’-তে ব্যবহার করে কোন রোগিকে সুস্থ করা যাবে না।

লোহিত রক্ত কণিকা- লোহিত রক্ত কণিকার (RBC) আবরণীতেও সায়ালিক এসিড আছে।চীনের দুই ইউনিভার্সিটির দুই গবেষকের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে করোনা ভাইরাস লোহিত রক্ত কণিকার হিমোগ্লোবিন থেকে আয়রনকে বের করে দেয় ফলে সেটি আর অক্সিজেন বহন করতে পারে না(রেফারেন্স ১৪,১৫) ।ফুসফুস থেকে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে হিমোগ্লোবিন।বের করে দেওয়া মুক্ত আয়রন সকল কোষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিধায় তাকে ফেরিটিন নামক প্রোটিন নিজের অন্তরে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখে।ফেরিটিন আবার রোগ প্রতিরোধী কোষ ম্যাক্রোফেজকে উদ্দীপ্ত করে জৈব রসায়ন ‘সাইটোকাইন’ নিঃসরণ করায় যার অনেক উপাদান প্রদাহ তৈরি করে।পরিমিত মাত্রার প্রদাহ শরীরের জন্য উপকারি কিন্তু সেটা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় তাহলেই বিপদ,এমনকি মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।করোনায় আক্রান্ত যারা ক্রিটিক্যাল কন্ডিসনে চলে যান তাদের রক্তে ফেরিটিন বেশি পাওয়া গেছে এবং তাদের অধিকাংশই ‘সাইটোকাইন ঝড়ে’ মারা পড়েন এমনকি ভেন্টিলেটরে থাকার পরও।এজন্য রক্তে ফেরিটিনের মাত্রাকে করোনা রোগির অবস্থা কতটা জটিল তা বুঝতে নির্দেশক হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কোথাও কোথাও। করোনা রোগের প্যাথোফিজিওলজির এই মডেলটি যদি সত্যি হয় তাহলো বিপদ অনেক বেশি। আপাত সুস্থ কিংবা সুস্থ হওয়ার পথে থাকা রোগিও অল্প সময়ে দ্রুত খারাপ অবস্থায় চলে যেতে পারে এবং এধরনের রোগিদের বেশিরভাগকেই বাঁচানো যাবে না।

উপরোক্ত বিষয়গুলো আলোচনা করার উদ্দেশ্য হলো করোনা রোগ নির্ণয়ে আমরা যেন কেবলমাত্র জ্বর-কাশি-গলাব্যাথা-শ্বাসকষ্ট এগুলোকে হলমার্ক সাইন না বানিয়ে ফেলি।বাংলাদেশে বেশ কিছু অস্বাভাবিক মৃত্যুর কেস দেখা গেছে যেখানে প্রধানত নিউরোলজিক্যাল বা পেটের পীড়ার উপসর্গ ছিলো।বিশ্বে অনেক করোনা রোগি পাওয়া গেছে যাদের একমাত্র উপসর্গ ছিলো নাকে গন্ধ না পাওয়া বা স্ট্রোক।আশা করি সংশ্লিষ্ট সবাই এ ব্যাপারে সচেতন হবেন।

রক্তনালীঃ রক্তনালীর ভিতরের আবরণী কোষের ( Endothelial cell) লুমিনাল সারফেসে সায়ালিক এসিড থাকে।সুতরাং এসব কোষকে করোনা ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে।এসব কোষ আক্রান্ত হলে সেপটিক সকের মত অবস্থা তৈরি হতে পারে।ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে, শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে; দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন কিডনি,লিভার,হার্ট ফেইল করতে পারে (MultiOrgan Failure) এবং রোগি মারা যেতে পারে।তাছাড়া রক্তনালীর প্রদাহের কারণে চামড়ায় রক্তের বিন্দু বা ছোপের মত দাগ (Rash) দেখা দিতে পারে। এরূপ অবস্থায় প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরতে পারে বিশেষত প্রস্রাবের সাথে।

বাংলাদেশের আনুমানিক ৮-১১ কোটি লোক করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এবং ৫-৭ লক্ষ লোক মারা যেতে পারে।কাজেই এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টায় আমাদের রসদ কেমন সেটার বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।কারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে জড়িত জাতীয় পর্যায়ের সবাই ‘আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে’ বলে বার বার আশ্বস্ত করলেও কর্মরত যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না।বিষয়টা বিশদ;তারপরেও মৌলিক কয়েকটা বিষয় তুলে ধরছি-

পিপিইঃ পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট।সোজা কথায় যুদ্ধের বর্ম।বাংলাদেশে কর্মরত আনুমানিক রেজিস্টার্ড ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা ১ লক্ষের উপর।যেহেতু করোনার উপসর্গবিহীন রোগির সংখ্যা অকল্পনীয় বেশি এবং ৮১% রোগির উপসর্গ খুবই মৃদু সুতরাং মহামারীর মাঝে দাঁড়িয়ে কে করোনা রোগি আর কে করোনা রোগি নয় তা নির্ণয় করে পিপিই পরার সিদ্ধান্ত নেওয়া আত্মহত্যার শামিল।ডাক্তার-নার্সরাই প্রথম সারির যোদ্ধা;আর ১জন ডাক্তার বা নার্স রাতারাতি তৈরি করা যায় না।সুতরাং এসব যোদ্ধাদের বাঁচাতে তাদের প্রত্যেককে রক্ষাবর্ম দিতে হবে।এছাড়াও রয়েছে স্যাম্পল সংগ্রহকারী,ল্যাব টেকনিসিয়ান ও অন্যন্য স্বাস্থ্যকর্মী যাদেরও পূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রয়োজন।পিপিই’র কয়েকটি উপাদান রয়েছে-গাউন, গ্লাভস, মাস্ক, গগলস, সু কভার, সার্জিক্যাল হেড কভার ইত্যাদি।এর মধ্যে গগলস ভিন্ন অন্য কোন উপাদান ‍পুনরায় ব্যবহার করা যায় না।যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই ডিউটিরত একজন ডাক্তার বা নার্স ৮ ঘণ্টা ডিউটিকালীন পেশাব-পায়খানা করবেন না এবং খাওয়া-দাওয়া করবেন না তাহলেও প্রতিদিন ১ লক্ষের অধিক পিপিই প্রয়োজন।যেহেতু বাংলাদেশে প্রায় ৪৫দিন আগে করোনা সনাক্ত হয়েছে সুতরাং করোনাযুদ্ধে যুদ্ধরত এসব যোদ্ধাদের ইতিমধ্যে ৪৫ লক্ষেরও বেশি পিপিই ব্যবহার করে ফেলার কথা।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক তারা গতকাল পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ লক্ষ পিপিই সংগ্রহ করেছেন এবং আনুমানিক ১১লক্ষ পিপিই বিতরণ করেছেন।সুতরাং বাংলাদেশের কোন ডাক্তার বা নার্স যদি অভিযোগ করেন যে তিনি পিপিই পাচ্ছেন না কিংবা পিপিই না পাওয়ার কারণে হাসপাতাল (হোক সেটা সরকারি বা বেসরকারি) বা প্রাইভেট চেম্বারে রোগি দেখতে আতঙ্কিত হচ্ছেন সেটা সত্যি, সত্যি, সত্যি।বেসরকারি ডাক্তার-নার্স ও অন্যন্য স্বাস্থ্য কর্মীদেরও নিরাপত্তা দিতে না পারা হবে ‘এক পায়ে দৌঁড়ে অলিম্পিকে সোনা জেতা’র চেষ্টার মত।সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ডাক্তার-নার্স এ মুহূর্তে অমূল্য সম্পদ।তাদেরকে বিশেষভাবে রক্ষা করা রাষ্ট্রের এক নম্বর কাজ।বিশ্বের প্রতিটি দেশেই পিপিই’র সংকট আছে এবং সেটাই স্বাভাবিক।এ কারণেই চীনে ডাক্তাররা ডায়াপার পরে তার উপর পিপিই পরেছেন।যুক্তরাজ্যের এক হাসপাতালের এই তিন নার্স ময়লা ফেলার ব্যাগিকেই পিপিই বানিয়েছেন যদিও শেষ রক্ষা হয়নি

পিপিই মান

এবার আসা যাক পিপিইর কোয়ালিটি নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘OSHA/ EPA’ প্রতিরক্ষার লেভেল ভেদে ৪ ধরনের পিপিই টাইপ নির্ধারণ করেছেন।এর মধ্যে থুবই সংক্রামক ভাইরাস ঠেকাতে যে ধরনের পিপিই পরতে হবে সেটা হলো লেভেল-এ।আর অপারেসনের সময় ডাক্তাররা যে প্রতিরক্ষা ড্রেস পরিধান করে থাকেন সেটার লেভেল-ডি যা কোন সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না।এজন্যই মিটফোর্ড হাসপাতালে এক করোনা রোগির জরুরি অপারেসনে অংশগ্রহণকারী সকল চিকিৎসক,নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।আমাদের দেশের স্বাস্থ্যবিদরা পিপিই’র লেভেলের বিষয়টা কী খেয়ালে রেখেছেন? লেভেল-এ পিপিই ব্যয়বহুল এবং অপ্রতুল তাই সকল ডাক্তারকে সেটা সরবরাহ করা বিশ্বের কোথাও সম্ভব না।আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইটালি, স্পেনের উন্নত দেশেও শতাধিক ডাক্তার করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

আরেকটি বিষয় হলো পিপিই পরা ও খুলে ফেলার একটা নির্দিষ্ট ক্রম অাছে।যদি এই ক্রম সঠিকভাবে অনুসরন না করা হয় তাহলে পিপিই পরার পরও একজন সংক্রমিত হতে পারেন।

আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরঃ করোনা আক্রান্ত রোগির জটিল অবস্থায় আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হয়।ল্যানসেটে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী চীনে করোনা আক্রান্ত ১৭% রোগির ভেন্টিলেসন সাপোর্ট প্রয়োজন হয়েছিলো। অবশ্য The Information, Communication, Awareness and Panic Management group of the Integrated Control Room for combating coronavirus in Bangladesh এর মতে ৫-৬% করোনা রোগির ভেন্টিলেসন সাপোর্ট দরকার হতে পারে।আবার বিবিসি’র এক রিপোর্ট অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তিকৃত ৩০% রোগির ভেন্টিলেসন সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।৫% নয় অামি যদি ভেন্টিলেসন প্রয়োজনের হার ১%ও ধরি তাও বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে ৮ লক্ষ করোনা রোগির ভেন্টিলেসন সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে।অথচ ১লা এপ্রিল ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সর্বমোট ১১৬৯টি আইসিইউ বেড রয়েছে এবং মোট ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ১৭৬৯টি।বিপরীতে ৩৩ কোটি জনসংখ্যার ( আমাদের প্রায় ডাবল) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ১,৬০,০০০টি ভেন্টিলেটর আছে এবং করোনা সংক্রমণের শুরুতেই সরকার আরও ১৬,০০০টি ভেন্টিলেটর যোগাড় করেছেন।এছাড়া মোটরগাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তার ৯৪,০০০ হাজার ভেন্টিলেটর উৎপাদন করছেন যা জুনের শেষ নাগাদ সরকারের হাতে আসবে।অর্থাৎ জুনের শেষ নাগাদ মার্কিন স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ২,৭০,০০০ টি ভেন্টিলেটর থাকবে।৩৩কোটি মার্কিন জনগণের জন্য ২,৭০,০০০ ভেন্টিলেটরের বিপরীতে আমাদের ১৭কোটি জনগণের জন্য রয়েছে ১৭৬৯টি ভেন্টিলেটর! নিজ দেশে করোনা ভয়াবহরূপ ধারণ করার পরও অপেক্ষাকৃত কম সংক্রমণের বাংলাদেশ ছেড়ে পশ্চিমা বিশ্বের নাগরিকদের পলায়নের হেতু কিন্তু এখানে থাকতে পারে।

অক্সিজেন সাপ্লাইঃ করোনা আক্রান্ত রোগিদের একটা বড় অংশ শ্বাসকষ্টে ভোগায় অক্সিজেন দিতে হয়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভিড-১৯ ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনে করোনা আক্রান্ত রোগিদের ১৯% এর অক্সিজেন থেরাপি লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে ১.৫ কোটিরও বেশি রোগির অক্সিজেন লাগতে পারে।সমস্যা হলো ‘পিক টাইম’ এ রোগির সংখ্যা অল্প সময়ে এত বাড়ে যে সেসময় পরিমাণমত অক্সিজেন সাপ্লাই দেওয়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও কঠিন হয়ে পড়ে।২লি/মি রেটে অক্সিজেন দিলেও একজন রোগির প্রতিদিন ২সিলিন্ডার (প্রতিটি সিলিন্ডারের ধারন ক্ষমতা প্রায় ১৫০০লি) অক্সিজেন লাগবে।বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিভাগ আশা করি সচেতন আছেন।

এছাড়াও আইসিইউ চালানোর জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যন্য সাপোর্ট টিম লাগবে।১১৬৯ টি অাইসিইউ বেডের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে লক্ষাধিক রোগির আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া কতটা সম্ভব???

টেস্ট কিট ও টেস্টিং ক্যাপাসিটিঃ করোনা যুদ্ধে জিততে ব্যাপকহারে টেস্ট করা প্রধান হাতিয়ার।করোনা টেস্ট করার ক্ষেত্রে আমাদের পারফর্মেন্স প্রথম দিকে বেশ শ্লথ থাকলেও এখন তা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।তারপরও পৃথিবীতে আমাদের পারফরমেন্স নিচের দিকেই আছে।প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যার বিপরীতে আমরা টেস্ট করেছি গতকাল পর‌্যন্ত ১৯৮টি। ভারত-৩৬৩ ,পাকিস্তান-৫৬৪ ,ভূটান-১১৬০৩ ,মালদ্বীপ-৭৬৫৭ , সৌদি আরব-৫৭৪৫ , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-১৩০৭১ , ইটালি-২৫০২৮ , স্পেন-১৯৮৯৬ , সিঙ্গাপুর-১৬২০৩ ,দঃকোরিয়া-১১৩৯০ [ সূত্র-worldometer,23rd April, at 12:26]

সার্বিক বিবেচনায় করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অন্যন্য দেশের মত আমাদেরও যুদ্ধ রসদের ঘাটতি রয়েছে এবং সেটা পূরণে নানা বিকল্প নিয়েও ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।কিন্তু আত্ম অহমিকায় ভূগে ‘আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে’ কিংবা ‘আমাদের প্রস্তুতি উন্নত বিশ্বের চেয়েও ভালো’ এসব কথার একসময় প্যানিক তৈরি হবে; তৈরি হবে অসন্তোষ ও গুজব।দ্বিধান্বিত, আতংকিত কিংবা অরক্ষিত যোদ্ধা দিয়ে কী করোনা যুদ্ধ জয় করা সম্ভব?

লকডাউনের মাধ্যমে কেবলমাত্র করোনা বিস্তারের হার কমানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে।করোনা সংক্রমণের হার কমানো গেলে তিনটে লাভ আছে-

১) ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা কমানো সম্ভব।

২) স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একসাথে বিপুল সংখ্যক রোগির চিকিৎসা দেওয়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পক্ষেও সম্ভব না।সেক্ষেত্রে প্রতিদিনের রোগির সংখ্যা কম হলে তাদের চিকিৎসা দেওয়া সহজতর হবে যেটা লকডাউনের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে।

৩)রোগিদের ঘরে ঘরে গিয়ে কেস ও কন্ট্যাক্ট টেসিং করা এবং আইসোলেসন ও কোয়ারেন্টাইন করা সহজ হয়।

কিন্তু লকডাউনের সুবিধা পেতে হলে অবশ্যই কড়া লকডাউন (Absolute & effective lockdown) এবং একইসাথে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপক হারে টেস্ট করতে হবে।কিন্তু কড়া লকডাউন বাস্তবতার নিরিখে অনেক দেশ বা সমাজে প্রায় অসম্ভব।এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো-

১)মানুষ সামাজিক জীব।মনস্তাত্বিক কারণেই তাকে পরস্পরের কাছে থাকতে হয়।হঠাৎ করেই তাকে সামাজিক দূরত্ব দীর্ঘ ও অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পালন করতে বললে সেটাতে অভ্যস্ত হওয়া বেশ কঠিন।

২)জীবিকা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে অনেকেই বের হতে বাধ্য হয়।

৩)নিয়ম না মানার সংস্কৃতি আমাদের মত দেশে একটা সাধারণ বাস্তবতা।

৪)তরুণদের মধ্যে একটা নেশায় জড়িত।নেশার দ্রব্য যোগাড় ও সেবনের জন্য তাদের পক্ষে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা বাস্তবতার নিরিখে প্রায় অসম্ভব।

৫)সমাজে ধর্মান্ধ গোষ্ঠির উপস্থিতি একটা বাস্তবতা।জাতীয় দূর্যোগে এরা আরও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।এদের কারণে সমাজ বা রাষ্ট্রে লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে বজায় রাখা অনেকসময় কঠিন হয়ে পড়ে।

আবার সামাজিক দূরত্বের পরিমাপ কতটা হবে তা নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি।প্রাথমিক পর্যায়ে ধারনা করা হয়েছিলো করোনা ভাইরাস রেসপিরেটরি ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় এবং ৩ফুট বা ১মিটারের বেশি দূরত্বে ছড়াতে পারে না।কিন্তু পরবর্তীতে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন করোনা ভাইরাস রেসপিরেটরি ড্রপলেট ছাড়াও বায়বীয় অণু (Airborne droplet Nuclei) আকারে ছড়াতে পারে এবং ৬ফুট বা ২মিটার পর্যন্ত ছড়াতে পারে।কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও ৩ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে যা বাংলাদেশও অনুসরণ করছে।কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি (Center for Disease Control) ২.১৫মি বা ৬.৫ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। অতি সম্প্রতি Massachusetts Institute of Technology (MIT) এর পার্টিকেল ফ্লুইড ডাইনামিসিস্ট প্রফেসর Lydia Bourouiba দেখিয়েছেন হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ৮.২ মিটার বা ২৭ ফুট পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।সুতরাং নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ২৭ ফুটের বেশি হতে হবে।

লকডাউন করে যেসব দেশ প্রাথমিক সাফল্য লাভ করেছেন তারা সবাই করোনা ছড়িয়ে পড়ার একেবারে শুরুতে তা কার্যকর করেছেন এবং তাদের জনগণও স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন।কিন্তু ইটালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট বা যুক্তরাজ্য ১-২ সপ্তাহ বিলম্বে লকডাউন করার পরিণতি ভোগ করছে।আর আমাদের দেশে করোনা উপস্থিত হওয়ার দেড় মাস পরেও লোকজনকে ঘরে রাখতে পুলিশ-র‌্যাব-সেনাবাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।১ মাস পরেও লক্ষলোকের অংশগ্রহণে জানাজা হয়!

উপরোক্ত বিষয়াদি বিবেচনায় করোনা মহামারী প্রতিরোধে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মত ব্যবস্থাসমূহ অামাদেরমত দেশে আশানুরূপ কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বাংলাদেশের জন্য একের উপর চার মুসিবত

বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় যে করোনা আতঙ্কের মাঝেই বাৎসরিক আরেক মুসিবত ডেঙ্গু উপস্থিত।গত বছর ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নেয় এবং ১লক্ষ ১হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্তের বিপরীতে ১৭৯ জন মারা যায়।১৭ই মার্চ ডেইলি স্টারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায় এবছর জানুয়ারি থেকে ১৬ই মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে ২৬৩জন ডেঙ্গু রোগি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪গুণ বেশি।বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর অর্থাৎ বৃষ্টিকালীন।শীতকালের অতি ঠান্ডায় প্রাকৃতিকভাবেই এডিস মশা মারা যায়।কিন্তু মারা যাওয়ার আগে ডিম পেড়ে রেখে যায় যা শুষ্কবস্থায় মাটিতে প্রায় ১বছর সজীব থাকে।পরবর্তীতে বৃষ্টি শুরু হলে তা থেকে এডিস মশা জন্মাতে শুরু করে।এডিস মশা ঘরোয়া মশা এবং এটি মূলত দিনের বেলা কামড়ায়। যেহেতু করোনার কারণে ঘরে মানুষ অনেকটা বন্দি অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে এবং এডিস মশা নিধনে কার্যকরী ব্যবস্থার ফলাফল দেখা যাচ্ছে না সেহেতু এবছর ডেঙ্গু রোগির সংখ্যা বাড়ার আশংকা রয়েছে যা করোনার ভারে ভারাক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ‘গোঁদের উপর বিষফোঁড়া’।

বাংলাদেশের আরেক বাৎসরিক প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলো বন্যা।অলরেডি অধিকাংশ নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে।আকস্মিক বন্যা ও বর্ষাকালীন বন্যায় অনেক মানুষ গৃহহীন ও কর্মহীন হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক থাকে না।করোনা মহামারী চলাকালীন বন্যার উপস্থিতি এ রোগের বিস্তারকে যেমন সহজ করতে পারে ঠিক তেমনি আক্রান্তদের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, আইসোলেসন ও কোয়ারেন্টাইন ও তদারকিতেও বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে।ডেঙ্গু ও বন্যা দুটোই করোনা মহামারীর পিক টাইম (তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে আমার মতে বাংলাদেশে করোনার পিক টাইম মে মাসের শেষ থেকে জুনের প্রথম পর্যন্ত হতে পারে) সময় আশংকাজনক মাত্রায় উপস্থিত হতে পারে।

করোনা ঠেকাতে মানুষ আজ গৃহবন্দি।এক দেশ থেকে আরেক দেশ বিচ্ছিন্ন।অর্থনীতির প্রায় স্থবির।ফলস্বরূপ ধেয়ে আসছে অর্থনৈতিক মন্দা।জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর প্রধান জানিয়েছেন যে করোনার কারণে আনুমানিক ৩কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে।অার করোনা রোগের কারণে মারা যেতে পারে ৩.৩ কোটি মানুষ।ব্যাপারটা অনেকটা ‘ডাঙ্গায় বাঘ পানিতে কুমির’ এর মত। অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির অতি মন্দা ঠেকাতে অনেক দেশই ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার আগেই লকডাউন শিথিল করছেন।আর এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন যে এসব দেশে করোনা সংক্রমণের নতুন ঢেউ আঘাত হানতে পারে।বাস্তবতা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে নিরাপদ লকডাউন শিথিলীকরণের গাইডলাইন প্রদান করতে হয়েছে।বাংলাদেশ-ভারতের মত ঘনবসতিপূর্ণ ও নিম্ন আয়ের দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে পরিপূর্ণ লকডাউন করাও যেমন কঠিন আবার লকডাউন দ্রুত শিথিল না করলে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়া অতি বাস্তব।এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাও দেখা দিতে পারে।ক্ষুধার্ত মানুষ হিংস্র বাঘের চেয়েও ভয়ংকর।এক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের সরকারকে বিশেষ প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিজস্ব কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।করোনা যুদ্ধে জিততে আমাদের ৩টি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে-

১)কৌশলগত লক্ষ্য Ro (R naught) কে ১ নিচে নামিয়ে আনাঃ সাধারণ ভাষায় Ro (R naught) হচ্ছে একজন আক্রান্ত রোগি থেকে গড়ে কতজন রোগি সংক্রমিত হয় তার গাণিতিক হিসাব। করোনা মহামারীর বৈশ্বিক ‘আর-নট’ যা বর্তমানে ২-৩.৫ এর মাঝে আছে। আর-নট যতক্ষণ ১ এর উপর থাকবে ততক্ষণ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আবার আর-নট ১ বরাবর হলে প্রতিদিন প্রায় একই সংখ্যক রোগি পাওয়া যাবে যাকে গ্রাফিক উপস্থাপনে ‘পিক বা চূঁড়া’ বলে।মহামারী দমনের এটি প্রাথমিক সাফল্য। যখন ‘আর-নট’ ১ এর নিচে নামবে তখন আক্রান্ত রোগির সংখ্যা কমতে শুরু করবে এবং একসময় রোগির সংখ্যা প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি চলে যদি ভাইরাসটি নতুন করে ছড়ানোর সুযোগ না পায়।

‘আর-নট’ ১ এর নিচে নামানোর ত্বাত্ত্বিক সমাধান হলো আক্রান্ত রোগিকে পৃথক করে রাখা যাতে রোগ ছড়াতে না পারে এবং অনাক্রান্ত ব্যক্তির প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ যাতে ভাইরাসটি তার শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। আর এ দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্যই আইসোলেসন, কোয়ারেন্টাইন, পিপিই পরা, টেস্ট করা, সাবান পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে বার বার হাত ধোয়া, লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা গণজমায়েত নিষিদ্ধ করার মত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।এসব টার্মের সাথে আপনারা বেশ পরিচিত তাই এসব বিষয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা না করে বরং পরবর্তী সেকসনে কিছু কার্যকরী ব্যবস্থা উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইং শায়া আল্লাহ।

২)অর্থনীতির চাকাকে যথাসম্ভব সচল রাখা-করোনা মোকাবেলায় দীর্ঘসময় লকডাউন চরম আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।তাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অত্যাবশ্যকীয় ও উৎপাদনশীল খাতের কারখানাগুলো খুলে দিতে হবে।তবে এক্ষেত্রে কর্মরতদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।এ বিষয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি ও তা কঠোর তদারকি করা দরকার।

কৃষিজ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।করোনা মহামারী পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও দূর্ভিক্ষ মোকাবেলায় আমাদের এক বিরাট শক্তি হলো আমাদের দেশের উর্বর জমি এবং কঠোর পরিশ্রমী কৃষক।সঠিক পরিকল্পনায় কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে শুধু নিজ দেশের চাহিদা পূরণই নয় বরং অন্য দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।এজন্য কৃষকদের প্রণোদনা ও কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা প্রদান করতে হবে।এছাড়াও প্রতিটি বাড়িতেই কিছু না কিছু কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের সামাজিক আন্দোলন বেগবান করা উচিৎ।

বিশ্বব্যাপি করোনা মহামারী বছর ধরে চলবে বলে আপাত মনে হচ্ছে।এমতবস্থায় সারা বিশ্বেই নানা রকম চিকিৎসা উপকরণ প্রয়োজন হচ্ছে এবং হবে।তাছাড়া দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণেরও প্রয়োজন হবে ব্যাপকভাবে।এসব উপকরণের মধ্যে যেগুলো আমাদের দেশে উৎপাদন করা সম্ভব সেসব শিল্পের দিকে দ্রুততার সাথে ঝুঁকে পড়তে হবে।সময় ও সুযোগ কারো জন্য অপেক্ষা করে না।করোনা পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ হবে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ।

৩)আপদকালীন সময় পার হওয়ার পর এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের বিষয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে সজাগ থাকতে হবে- এটা একটা কঠিক পর্যায়।কারণ কেস কমতে শুরু করলে এবং প্রতিরোধী ব্যবস্থাসমূহ শিথিল করতে শুরু করলে স্বস্তির বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারে মানুষ গা ভাসিয়ে দিতে পারে।মনে রাখবেন করোনা কিন্তু ওঁৎ পেতে আছে।সামান্যতম শিথিলতায় করোনা মহামারীর নতুন ঢেউ আছড়ে পরতে পারে।

ফেস সিল্ড ব্যবহার করতে হবে-রবীন্দ্রনাথের জুতা আবিষ্কার গল্পে ধূলার হাত থেকে রাজার পা বাঁচাতে রাজ মন্ত্রকদের পরামর্শে ঝাঁড়ু দিয়ে পুরো রাজ্যকে ধূলি ধূসরিত করা হয়েছিলো এবং কৃতকর্মের কুফল থেকে বাঁচতে পানি ছিটিয়ে পুরো রাজ্যকে কর্দমাক্ত করা হয়েছিলো কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।শেষ পর্যন্ত মূচি পা চামড়া দিয়ে ঢাকার বুদ্ধি দেন-আবিষ্কার হয় জুতা।ঠিক করোনার হাত থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস ব্যবহার করছে জনগণ।কিন্তু এগুলোর সঠিক ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হচ্ছে না বিধায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সার্জিকাল মাস্কের বাইরের দিকে করোনা ভাইরাস ৭দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।কোন মাস্কেরই ফিতা ভিন্ন অন্য অংশ স্পর্শ করা যাবে না এবং একবার ব্যবহারের পর তা বর্জন করাই আকাঙ্খিত। কিন্তু আমরা একটা মাস্ক দিনের পর দিন ব্যবহার করছি,তাকে পকেটে নিয়ে ঘুরছি কিংবা যেখানে-সেখানে রাখছি এবং কথা বলার সময় হাত দিয়ে টেনে নামিয়ে আবার তা হাত দিয়ে টেনে নাক-মুখে সেট করছি।এটাতো করোনা প্রতিরোধ করবেইনা বরং করোনাকে দেহে প্রবেশে সহায়তা করবে।আমাদের আরেকটি সমস্যা হলো আমরা ঘন ঘন চোখ-নাক-মুখে হাত দিই।সহজাত আচরণ রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ফেস সিল্ড ব্যবহার একটা কার্যকরী উপায় হতে পারে।যেহেতু করোনা ভাইরাস চোখ-নাক-মুখ তিন পথেই প্রবেশ করতে পারে।ফেস সিল্ড এ তিন পথকেই ঢেকে রাখে এবং হাত দিয়ে এসব জায়গা স্পর্শ করা প্রতিহত করতে পারে।ফেস সিল্ডগুলো সাবান-পানি, স্যানিটাইজার বা ডিটারজেন্ট পানি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়।তবে ডাবল প্রটেকসনের জন্য মুখে মাস্ক লাগিয়ে তার উপর ফেস সিল্ড পরতে হবে।আর এ ফেস সিল্ডগুলো খুব কম খরচে তৈরি করা সম্ভব।

নিরাপত্তা সামগ্রীর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে- জীবাণুনাশক হিসাবে ব্যবহৃত সামগ্রী সঠিক পরিমাণে ও সঠিক উপায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।এছাড়াও প্রতিরোধক সামগ্রী যেমন পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।ব্যবহৃত নিরাপত্তা সামগ্রীর নিরাপদ ডিসপোজাল নিশ্চিত করতে হবে।এগুলো না করলে করোনা বিস্তার রোধ তো দূরের কথা বরং করোনা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাবে।

ঝুঁকিপূর্ণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে– করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন তাদের সিংহভাগই ৬০বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষ।তাছাড়া যাদের হার্টের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা (COPD), ক্রনিক রেনাল ফেলিওর, ডায়াবেটিস বা ক্যান্সারের মত সমস্যা আছে তাদের মধ্যে মৃত্যু হার বেশি।শুধুমাত্র ষাটোর্দ্ধ মানুষ এবং এ ধরনের রোগিদের বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করলে করোনার সার্বিক মৃত্যুসংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে ফেলা সম্ভব।অপরদিকে করোনা যুদ্ধের প্রথম সারির যোদ্ধা সরকারি- বেসরকারি সকল কর্মরত ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।এছাড়া প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যেভাবে রাস্তা-ঘাটে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে করোনা দমন তো দূরের কথা বরং তারাই করোনা আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে।তাদেরও সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা জারি করুন; কারফিউ দিন।প্রয়োজনে নন লিথ্যাল অস্ত্র ব্যবহার করুন।

অনির্দিষ্টকালের জন্য গণজমায়েত নিষিদ্ধ রাখতে হবে-কাঁচাবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সকল ধরনের ধর্মীয় জমায়েত, আন্দোলন বন্ধ রাখতে হবে।প্রতিটি এলাকায় ‘কমিউনিটি শপ’ চালু এবং এলাকার তরুণ ভলান্টিয়াদের মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সাবান-স্যানিটাইজারের পরিবর্তে ‘সোপিওয়াটার’ ব্যবহার করতে পারেন– কলেরা হাসপাতালখ্যাত আসিডিডিআরবি’র বিজ্ঞানীরা ‘সোপিওয়াটার’ আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে ১টাকায় ৮০ বার হাত ধোঁয়া যায় এবং এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত। সুতরাং দামি সাবান বা স্যানিটাইজার ব্যবহার না করে এই সোপিওয়াটার ব্যবহার করলে ব্যয় সাশ্রয়ী হবে।ফর্মূলা একদম সহজ- দেড় লিটার পানিতে ৪ চা চামচ ডিটারজেন্ট।হাত পরিষ্কারের জন্য ৩০ এমএল যথেষ্ঠ।যে কোন জায়গায় ছোট বোতলে করে নিয়ে যেতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় পানি না পেলেও সমস্যা হবে না।

PPV- মুমূর্ষ করোনা রোগিকে বাঁচানোর ফ্রি উপায়ঃ করোনায় আক্রান্ত প্রায় ১৯% রোগিকে শ্বাসকষ্ট কমাতে অক্সিজেন দিতে হয়।আবার ৩-৫% রোগির শ্বাসকষ্ট এত তীব্র হয় যে জীবন বাঁচাতে ভেন্টিলেটরের সাহায্য নিতে হয়।কিন্তু ভেন্টিলেটরের স্বল্পতা হেতু অনেকসময় রোগিকে বাঁচানো যায় না।অথচ তীব্র শ্বাস কষ্টের (Acute Respiratory Distress) শুরুতে রোগিকে উপুড় করে শুইয়ে দিলে রোগির রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ে এবং শ্বাসকষ্ট কমে যায়। এটাকে Prone Position Ventilation (PPV) বলে।এ পদ্ধতিতে অনেকসময় ভেন্টিলেটরে দেওয়ার উপযুক্ত রোগিকেও ভেন্টিলেটরের সাহায্য ছাড়া বাঁচানো যেতে পারে।আমাদের মত দেশে যেখানে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংখ্যা অনেক কম সেখানে করোনা আক্রান্ত রোগির চিকিৎসায় এ পদ্ধতির প্রয়োগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পিপিভি কীভাবে কাজ করে তা জানতে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন-

করোনা প্রতিরোধী ঔষধ- ম্যালেরিয়ার ঔষধ ক্লোরোকুইন করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় খানিকটা সফলতা দেখিয়েছে। ভারতের চিকিৎসকদের এ ঔষধটি করোনা প্রতিরোধে খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়াও উচ্চমাত্রার ভিটামিন-ডি এবং জিংক করোনা প্রতিরোধে ও করোনা জটিলতা কমাতে সহায়ক।প্রথম শ্রেণির করোনা যোদ্ধা ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, করোনা পরীক্ষাগারে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং যারা করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদেরকে এ ধরনের রোগ প্রতিরোধি ঔষধ দেওয়া যেতে পারে।

CONVALESCENT PLASMA THERAPY– এটা প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো পদ্ধতি যখন ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিভাইরাল ছিলো না।১৯১৮ সালের ‘ফ্লু প্যানডেমিক’ এ প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলো।সেসময় চিকিৎসকরা এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন।যে কোন ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে শরীর তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে আর এই অ্যান্টিবডিই ভাইরাসকে মেরে ফেলে রোগ মুক্তি ঘটায়।যে রোগি মাত্রই রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে (রোগাক্রান্ত থেকে রোগমুক্তির প্রাথমিক পর্যায়টাকে ‘কনভ্যালিসেন্স স্টেজ’ বলে) তার রক্তে অ্যান্টিবডি থাকে।এখন এই সদ্য রোগমুক্তি পাওয়া ব্যক্তির প্লাজমা বা রক্তরস যদি কোন রোগাক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করানো হয় হয় তাহলে রেডিমেড অ্যান্টিবডি ভাইরাস মারতে শুরু করবে তাৎক্ষণিকভাবে।ফলে রোগের প্রকোপ কমে যাবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে।যেহেতু সময়ের সাথে সাথে শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যেতে পারে তাই সদ্য রোগমুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির রক্তই কেবল সর্বোচ্চ কার্যকর হওয়া যুক্তিযুক্ত।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সীমিত আকারে এ পদ্ধতি প্রয়োগে সাফলতা পাওয়া গেছে।আশা করি আমাদের দেশের চিকিৎসরা এ পদ্ধতিটির কথা ভেবে দেখবেন।

শাক-সবজির পরিবর্তে ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট খান-করোনা পানি বাহিত হতে পারে।ভালোভাবে উচ্চতাপে অধিকক্ষণ রান্না না করলে কিংবা কাঁচা অবস্থায় খেলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েই যায়।আমরা শাক-সবজি, ফল-মূল খেয়ে থাকি মূলত ভিটামিন ও খনিজ লবণের জন্য।আমরা যেভাবে শাক-সবজি রান্না করি তাতে অনেক ভিটামিনই নষ্ট হয়ে যায়।ভিটামিন-এ কে বলা হয় সংক্রমন বিরোধী ভিটামিন (Anti-infective vitamin)।ভিটামিন-ডি এর অভাবেও জীবাণুর শরীরে প্রবেশ সহজ হয়; অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পূর্বে ভিটামিন-ডি ই ছিলো যক্ষারোগের প্রধান হাতিয়ার।তাছাড়া ভিটামিন-ডি সাইটোকাইন মডিউলেটর- এটি প্রদাহকারী সাইটোকাইন তৈরিতে বাঁধা দেয় এবং প্রদাহবিরোধী সাইটোকাইন তৈরিতে সহায়তা করে।‘প্রদাহকারী সাইটোকাইন ঝড়’ এর কারণেই করোনা রোগিরা মূলত তীব্র শ্বাসকষ্টে (acute respiratory distress syndrome) ভূগে থাকেন; এমনকি ভেন্টিলেটরে দেওয়ার পরও ৭০%-৮০% রোগিকে বাঁচানো যায় না।এবিষয়ে আরও জানতে ৯ ও ১০ নং রেফারেন্স ক্লিক করুন।ভিটামিন-ডি ৯০% তৈরি হয় সূর্যের আলোতে চামড়ার নিচে।এখন দীর্ঘদিন লকডাউনে থাকলে শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরি বাঁধাগ্রস্থ হবে।তাছাড়া প্রাকৃতিক উৎস্যের ভিটামিন-ডি অপ্রতুল ও দামি।বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ জিংকের অভাবে ভূগছে।জিংক সংক্রমণ প্রতিরোধে, অ্যান্টিবডি তৈরিতে এবং ‘সাইটোকাইন ঝড়’ প্রতিহত করতে সহায়তা করে।রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন-সি এর ভূমিকা সর্বজ্ঞাত।তাছাড়া যাদের শরীরে রক্তাল্পতা রয়েছে তাদের শ্বাসকষ্টের তীব্রতা বেশি হতে পারে।দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠির এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতি রয়েছে।অল্প সময়ে এসব ঘাটতি পূরণ ও দৈনন্দিন চাহিদা খুব সহজেই মাল্টিভিটামিন ও মাল্টিমিরারেল ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল বা সিরাপ আকারে দেওয়া যেতে পারে।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুনঃ আমরা ভাত-রুটি খেয়ে থাকি মূলত দেহের প্রধান শক্তি উৎপাদনকারী উপাদান শর্করা পেতে।১কেজি খোলা চাল ৪৫-৬০টাকা আর ১কেজি খোলা আটার দাম ২৫-৩০টাকা।ভাতের চেয়ে রুটি প্রাপ্ত শর্করার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।আর আটায় প্রোটিনের পরিমাণ চালের চেয়ে প্রায় ৪গুণ বেশি।প্রোটিন পরিমাণ বিচারে ১০০গ্রাম গরুর মাংস (৫৫টাকা)= ৩০০গ্রাম গমের আটা(৯টাকা)। রুটি শুকনো খাবার বিধায় এটা অধিকক্ষণ সংরক্ষণ ও বিতরণ সহজ।আমি নিজেও আটার ব্যবহার বাড়িয়েছি। জাপানিরা ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে নিজেদেরকে শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করেছে।আমাদেরও সে চেষ্টা করা উচিৎ।

করোনার বিরুদ্ধে আমাদের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রক্ষা নেই।।প্রাণিজ প্রোটিন তথা মাছ, মাংস, দুধ, ডিমে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল অ্যামাইনো এসিড রয়েছে।কিন্তু উদ্ভিজ্জ্য প্রোটিন যেমন ডাম, শীমের বীচি, কাঠালের বীচি ইত্যাদিতে সব প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো এসিড একসাথে থাকে না।কিন্তু কয়েক ধরনের ডাল একসাথে মিশিয়ে রান্না করলে তা থেকে সকল অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায় এবং এজন্যই ডালকে বলা হয় ‘গরীবের মাংস’।প্রাণিজ প্রোটিনের দাম বেশি হওয়ায় এবং কয়েক ধরনের ডাল একসাথে মিশিয়ে রান্না করার সংস্কৃতি আমাদের মাঝে না থাকায় নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ প্রোটিনের অভাবে ভূগে থাকেন।কিন্তু করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রোটিন খেতে হবে।এজন্য কয়েক ধরনের ডাল একসাথে মিশিয়ে খাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

ফ্লোর বা জমিনের করোনা থেকে সাবধান!– করোনা ভাইরাস হাঁচি-কাশি বা কথা বলার সময় রেসপিরেটরি ড্রপলেট বা নিউক্লিয়াই আকারে বের হয়।এরা বেশিক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না এবং একসময় জমিনে পড়ে সেখানে লেগে থাকে।এগুলো আপনার পা বা সেন্ডেলের সাথে লেগে আপনার বিছানা বা ব্যবহৃত অন্যন্য জিনিসের সাথে লেগে একসময় আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।এজন্য ঘরে কিংবা ঘরের বাইরে খালি পায়ে হাঁটবেন না।বাইরে যাওয়ার সেন্ডেল-জুতা ঘরের বাইরে রাখুন।বিছানায় উঠার আগে পা সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে ধুয়ে উঠুন।ঘরের ফ্লোর বার বার জীবাণুনাশক দিয়ে মুছুন। মাটিতে বা ফ্লোরে বসে কাজ করা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন; অপারগতায় প্রতিরোধী ব্যবস্থা নিন।ছোট বাচ্চাদের ব্যাপারে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করুন।

শুরুতেই আগ্রাসী চিকিৎসা করতে হবে– গত ৪মাসে করোনা সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে তাতে থেকে এটা স্পষ্ট যে দেহে করোনা ভাইরাসের সংখ্যা যত বেশি হবে ক্ষতিও তত বেশি হবে।এজন্য রোগের শুরুতে যখন ভাইরাসের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে তখনই কঠোরভাবে ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে।দেহের সক্ষমতার (COMPENSATORY MECHANISM) অতিরিক্ত ভাইরাল লোড হলে তা থেকে সৃষ্ট জটিলতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং অনেক রোগি মারাও যেতে পারে।‘কনভ্যালিসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’র ক্ষেত্রে কিছুদিন আগে একজন বিষেশজ্ঞকে বলতে শুনলাম ‘এটা আমরা জটিল পর‌্যায়ের রোগিদেরকে দেওয়ার কথা ভাবছি’। করোনা একবার জটিল পর‌্যায়ে চলে গেলে সেটা যে কতটা ভয়াবহ হতে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে সেটা উন্নত বিশ্বের আইসিইউ তে মারা যাওয়া রোগির সংখ্যা থেকেই ধারনা পাওয়া যায়।

করোনা বিস্তারের ধরন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ মাত্রায় তথা পিক লেভেলে পৌঁছাতে পারে মে মাসের শেষে কিংবা জুনের প্রথমদিকে।পিক লেভেলে উঠার পর সাধারণত কেস সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে।কিন্তু মে মাসে ঘটতে যাওনা নানা ঘটনার কারণে করোনা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

আগামি দু একদিনের মধ্যে রমজান শুরু হতে যাচ্ছে।সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ।ধর্মানুরাগীদের জন্য নেকি কামানোর ও গুণাহ মাফের পিক সময় রমজান মাস।ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য টাকা সংগ্রহের পিক সময় এটা।ধর্ম ব্যবসায়ীদের দুনিয়াবি মাল হাসিলের পিক সময় এটা।ধর্মান্ধদের জজবা দেখানোর জন্য এটা পিক সময়।যাকাত সারা বছর দেওয়ার বিধান থাকলেও রমজান মাস যাকাত দাতা ও গ্রহীতাদের জন্য পিক সময়।দান খয়রাতের পিক সময় এটা।বস্ত্রব্যবসায়ীদের জন্য লকডাউনে বৈখাখি বাজার হাত ছাড়া হয়েছে; বরাবরের মত রমজান তাদের জন্য পিক সময়।এসময় মানুষ অন্যন্য মাসের তুলনায় অনেকবেশি কেনাকাটা করে ফলে অনেক ব্যবসারই জন্য এটা পিক সময়।ডেঙ্গুর জন্যও এটা পিক সময়।ঝড় বৃষ্টি বাদলের পিক সময় মে-জুন।১মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারি ছুটি চলছে।অর্থনীতির চাকা সচল করতে সরকারও বাধ্য হবে অনেক শিল্প কল কারখানা খুলে দিতে।খুলবে কিছু প্রয়োজনীয় অফিসও।কর্মরতদের যাতায়াতের জন্য সীমিত আকারে হলেও গণ পরিবহন খুলে দিতে হবে।যাদের ঘরে আর মন টিকেনা তাদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার এটা পিক সময়।সুতরাং এতগুলো মানুষের প্রয়োজন পূরণের পিক টাইম খুবই কাছে।আবেগ ও আবশ্যকীয়তায় আগামী দিনগুলোতে সারাদেশেই করোনা প্রতিরোধী ভঙ্গুর অবস্থা চরম ভঙ্গুরতায় পৌঁছে যেতে পারে।আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে করোনা হয়ে উঠতে পারে মূর্তিমান আতংক; কেড়ে নিতে পারে অনেক মানুষের জীবন।।তাই আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য বড়ই আতংকের।

করোনা মহামারীর পিছু পিছু আরেক দানব এসে গেছে যার নাম ‘অর্থনৈতিক মন্দা’।ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের প্রধান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন করোনা মহামারীর কারণে পৃথিবীতে অনাহারে ৩কোটি মানুষ মারা যেতে পারে।আর নিম্ন আয়ের দেশ হিসাবে আমরাই উভয় অবস্থায় যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবো তা বলাই বাহুল্য।যার পতন হয় সে ছাড়া নাকি সবাই সেটা দেখতে পায়।আমাদের বেপরোয়া আচরণ সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।বিশ্ব এখনও করোনার ভয়াবহ রূপ দেখেনি।মৃত্যু আর ক্ষুধার পদধ্বনি তাদের কানে পৌঁছেনি।দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বহীনতা, মূর্খদের পান্ডিত্য, পেশাজীবিদের অপেশাদার আচরণ এবং আম জনতার বেপরোয়া মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে আমাদের সচেতন মানসিকতার মৃত্যু হয়েছে।কেন জানি আমার এই প্রিয় দেশটাকে জম্বিল্যান্ড মনে হচ্ছে!

ধন্যবাদ যারা কষ্ট করে দীর্ঘ এই লেখাটি পড়লেন।

বি.দ্র: – এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক।এটি চিকিৎসকের বিকল্প নয়।এতে ব্যবহৃত ছবিসমূহ ইন্টারনেট থেকে নেওয়া এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি।তারপরও কোন ক্ষেত্রে কপিরাইট ভায়োলেসন হয়ে থাকলে জানানো মাত্র তা অপসারণ করা হবে।